উস্তাদ আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ

উস্তাদ আব্দুর রাজ্জাকের ব্যাপারে দুটো কথা :
.

দাওয়াতি ময়দানে উস্তায আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ (হাফিয্বাহুল্লাহ)-র অবদান ও নিরলস প্রচেষ্টা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। একজন মুখলিস দাঈ, একজন যোগ্য পিতা, একজন উত্তম স্বামী ও একজন অকুতোভয় দাঈ ইলাল্লাহ হিশেবে উনার অবদান অনস্বীকার্য। একেক ফুলের ঘ্রাণ যেমন একেক রকম, ঠিক তেমনি একেক দাঈর বক্তব্যের স্টাইলও একেক রকম। যাইহোক, অতি সম্প্রতি উস্তায আব্দুর রাজ্জাক (হাফিয্বাহুল্লাহ)-কে নিয়ে ফেইসবুক পাড়ায় আলোচনা – সমালোচনার ঝড় বইছে। এতে তিন ক্যাটাগরির লোকজন যোগ দিয়েছেন। যথা:

১. হিজবিয়্যাহ (দলবাজ)।
২. ব্যক্তি বিদ্বেষী এবং
৩. সালাফদের মানহাজের প্রতিনিধিত্বকারী।
.
চলুন এই তিন ক্যাটাগরির লোকদের ব্যাপারে একটু আলোচনা করা যাক —
.

১. হিজবিয়্যাহ (দলবাজ) :
.
নির্দিষ্ট কোনো সংগঠনের প্রতি বিশেষ প্রীতি এবং অন্য সংগঠনের প্রতি বিদ্বেষ হল হিজবিয়্যাহদের অন্যতম একটি লক্ষণ। যার ফলশ্রুতিতে সংগঠনকে কেন্দ্র করেই ‘ওয়ালা ও বারা’ আবর্তিত হয়। অর্থাৎ, কেবলমাত্র সংগঠনের জন্যই মিত্রতা আর সংগঠনের জন্য বৈরিতার বিশ্বাসী। এর আরেকটা কুফল হল, সংগঠনে থাকলে মাযহাবী কায়দায় সাংগঠনিক বক্তার ভ্রম ও প্রমাদগুলোও ডিফেন্স করা এবং সংগঠন না থাকলে পান থেকে চুন খসলেই চেপে ধরার প্রবনতা দেখা যায়।
এই নিকৃষ্ট হিজবিয়্যাহ (দলবাজি) সম্পর্কে ইমাম মুক্ববিল আল-ওয়াদি‘ঈ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, “দলবাজি হলো সংকীর্ণ মিত্রতা, এর ফলে সে দলের জন্য মিত্রতা স্থাপন করে এবং দলের জন্যই বৈরিতা পোষণ করে। (আর তার স্বরূপ হলো) তাদের সাথে যে রয়েছে, তারা কেবল তাকেই সম্মান করে এবং তার বক্তব্য শোনার দিকে ও তার পাশে একত্রিত হওয়ার দিকে মানুষকে আহ্বান করে। আর যে ব্যক্তি তাদের সাথে নেই, সে তাদের শত্রু হিসেবে পরিগণিত হয়।”
— [তুহফাতুল মুজীব ‘আলা আসইলাতিল হাদ্বিরি ওয়াল গরীব; পৃষ্ঠা: ১১১/১১২]
.
আমাদের সকলের একথা জেনে রাখা আবশ্যক যে, কোনো একটি সংগঠনে নিজেকে জড়িয়ে ফেলা যেমন আবশ্যিক নয়, ঠিক তেমনি কোনো একটি দেশে দাওয়াতি কাজের প্রচার-প্রসারে একের অধিক সংগঠন থাকাও দোষনীয় নয়! কিন্তু তাতে যদি হিংসা বিদ্বেষ , কাঁদা ছোড়াছুড়ি, বিচ্ছিন্নতা কিংবা বন্ধুত্ব ও শত্রুতার মানদণ্ড হিসেবে সংগঠনকে দাঁড় করানো হয়, তাহলে এমন সংগঠনগুলো ফিতনা বৈ আর কিছুই নয়।
.

২. ব্যক্তি বিদ্বেষী :
.
ব্যক্তির প্রতি অনেক কারণেই বিদ্বেষভাব তৈরি হয়। ব্যক্তির সম্মান, কবুলিয়াত , প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির প্রতি হিংসা কিংবা দাওয়াতি পদ্ধতি অপছন্দ হওয়া অথবা ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার সাথে বনিবনা না হওয়া ইত্যাদি। শব্দচয়ন ও রদের স্টাইল দেখেই এই বিষয়টা অনুধাবন করতে পারবেন।
.

৩. সালাফদের মানহাজের প্রতিনিধিত্বকারী:
.
এই ক্যাটাগরির লোকদের রদ বা সমালোচনাকে আমরা সাধুবাদ জানাই এবং এরা প্রশংসা পাওয়ার দাবিদার। কেননা, দলবাজি ও ব্যক্তিগত বিদ্বেষের ঊর্ধ্বে উঠে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যেই তারা এই খেদমতের আঞ্জাম দিয়ে থাকেন। এতে সুন্নাহর প্রতিবিধান অনুযায়ী আদল- ইহসান-ইনসাফ করা হয়।
.

নিবন্ধকের কিছু কথা :
.
একজন দাঈ, বক্তা কিংবা আলিম সালাফি হওয়া স্বত্তেও জাহলাতের কারনে কিংবা ফিরাসাতের অভাবে কোন একটা বিষয়কে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে নাও পারেন। তাই বলে তিনি পুরোপুরি পথভ্রষ্ট কিংবা সালাফি মানহাজ থেকে খারিজ এমনটা মনে করার কোনো কারণ দেখিনা। তিনি হয়ত অন্যান্য ক্ষেত্রে অনেক ইলম রাখেন, বাদবাকি খেদমতেরও আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর বক্তব্য শুনে হয়ত অনেক বিদ’আতি বিদ’আত ছেড়েছেন, অনেক বে-নামাজী নামাজ ধরেছেন, অনেক বেদ্বীন – দ্বীনমুখী হয়েছেন, সুতরাং এক্ষেত্রে তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, তীর্যক মন্তব্য করা, ব্যাঙ্গ করা ইত্যাদিকে যদি আমরা নিজেদের উদ্দেশ্য বানাই – তবে ইয়াওমুল ক্বিয়ামাহতে আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে। কেননা, আমার দ্বারা শুধুমাত্র তাঁর চামড়া উত্তোলনের কাজটুকু হয়েছে কিন্তু উম্মাহর জন্য কোনো খা’য়ের (কল্যাণ) বয়ে আনে নি।
.
যদি তিনি সুন্নাহর অনুসারী হন, তাহলে আমাদের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত তাঁর ইছলাহের চেষ্টা করা, তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে হক’টা জানানো এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর ইলমের ভান্ডার থেকে নিজেরা উপকৃত হওয়া। সর্বোপরি, তাঁর এবং নিজেদের জন্যে জান্নাতের পথ সুগম করা। এক্ষেত্রে সবচাইতে নিরাপদ একটা সুরত হল, রদ বা সমালোচনার ক্ষেত্রে ইফ্বরাত – তাফ্বরীত না করা।
.

এবার উস্তায আব্দুর রাজ্জাক প্রসঙ্গে কিছু কথা :
.
উস্তায আব্দুর রাজ্জাকের কিছু বক্তব্য অবশ্যই গলদ ও বিভ্রান্তিকর। উনার শব্দচয়ন ও বাচনভঙ্গি অবশ্যই আপত্তিকর। ফিক্বহী দূর্বলতাও দৃশ্যমান। সম্প্রতি উস্তায আব্দুর রাজ্জাক সাহেবের বিষয়ে যা বলা বা লিখা হচ্ছে এই বিষয়ে আমার অবস্থান হলো – আমি উস্তায আব্দুর রাজ্জাকর ভুলগুলিকে স্বীকার করি, উনার ইসলাহ চাই, উনার কঠোর অবস্থান ও হটকারিতা অপছন্দ করাসহ কিছুক্ষেত্রে উনার সাথে বিরোধ রাখি। পাশাপাশি উনার অন্ধ ভক্তি ও সমালোচনায় ক্ষেত্রে “গুলু” করা থেকে নিজের জবান ও হাতকে বিরত রাখার চেষ্টা করি।
.
বলা বাহুল্য যে, আমরা সর্বদা কোনো একজন দাঈকে রদ করা আর ডাবল স্ট্যান্ডার্ডবাজি করে আরেকজনের ভুলকে এড়িয়ে যাওয়ার বিপক্ষে। আপনি আমাকে বলেন — ইখওয়ানী ফিতনা ও তাদের আশ্রয়দাতাদের ব্যাপারে আপনার অবস্থান কি? লীগের হয়ে ইলেকশন করার ব্যাপারে আপনার অবস্থান কি? গনতান্ত্রিক রাজনীতিমুখী হওয়ার ব্যাপারে আপনার অবস্থান কি? সেক্যুলারিজম ও সেক্যুলার বলয়ে গঠিত দলগুলোর সাথে উঠাবসার ব্যাপারে আপনার অবস্থান কি? সাংগঠনিক নেতাদের সামনে বিদ’আতি মুনাজাতের পক্ষে সাফাই গাওয়া অত: পর নেতাদের নিরবতা – এসবের ব্যাপারে আপনার অবস্থান কি? সেন্টারগুলো ও সংগঠনগুলোতে গাপটি মেরে থাকা জামাতিদের ব্যাপারে আপনার অবস্থান কি?

আমাদেরকে অবশ্যই এসব ব্যাপারে সুরাহায় আসতে হবে। ডাবল স্ট্যান্ডার্ডবাজি চলবেনা। যারা অলরেডি সালাফদের মানহাজ লাল কার্ড দেখিয়ে দিয়েছে তাদের কলমে রদের স্লোগান গুরুত্বহীন। তবে হ্যাঁ, রদ শুধুমাত্র তারাই করবে যারা সত্যিকারার্থে সালাফদের প্রতিনিধিত্বকারী।
.
আমরা মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ূয়া অনেকের খবর জানি। তাদের ঘৃন্য দলবাজির রোষানলে পড়ে একজন তুল্লাব পিএইচডি না করেই দেশে ফিরে এসেছেন, এমন রেকর্ডও রয়েছে। তারাই যখন উস্তায আব্দুর রাজ্জাক সাহেবকে ইমাম আব্বাদের সাথে বসাতে চায় – তখন তাদের মতলব বুঝতে আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না।
এমনটা ভাববারও কোনো কারণ নেই যে, তিনি না বসে এক্কেবারে কবীরাহ গুনাহ করে ফেলেছেন।
.
যাইহোক, বলতে গেলে অনেক কথাই বলা যেত কিন্তু আমরা বিদ’আতিদের হাতে অস্র তুলে দিতে চাইনা আর তাই এখানেই ইতি টানছি। অন্যকে আব্বুকানা বলে নিজেরা যেন দলকানা থেকে না যাই।
.
মহান আল্লাহ্ আমাদেরকে দলবাজি, ব্যক্তি বিদ্বেষের ঊর্ধ্বে উঠে সালাফী মানহাজের উপর অটল রাখুন এবং এর উপরই আমাদের মৃত্যু দিন — আমীন।
▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬

Updated: April 2, 2020 — 11:03 am

The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *