অসফল প্রেম ও আত্মহত্যা

অসফল প্রেম ও আত্মহত্যা

অসফল প্রেমের একটি অনিবার্য পরিণতি আত্মহত্যা। প্রেমের একনিষ্ঠতা ও আন্তরিকতায় ধোঁকা খেয়ে গেলে আক্ষেপের সাথে নিজেকে ধিক্কারে ধ্বংস ক’রে দিতে ইচ্ছে হয়। তখন আত্মহত্যা করা কঠিন মনে হয় না। ভালোবাসার পাত্র ফাঁকি দিলে, মন-চোর হাতছাড়া হলে ক্ষোভে আত্মহনন করে কোন কোন প্রেম-পাগল। প্রেমকান্ড জানাজানি হওয়ার পর জীবনের চারিদিক থেকে লাঞ্ছনা, অপমান, হতাশা ও মানসিক পীড়ন ঘিরে ধরলে আত্মঘাতী হয় অনেক প্রেমের নায়ক-নায়িকা। গাঢ় প্রেমের পর কোন কারণে উভয়ের মাঝে বিবাহে বাধা পড়লে এবং এ জগতে একমাত্র চাওয়া ও পাওয়া মন-প্রাণ দিয়ে চেয়েও না পাওয়া গেলে, জীবন রাখায় যে লাভ আছে, তা মনে করে না অনেকে। জীবন দুর্বিষহ বিষময় হয়ে উঠলে বিষ খেয়ে সেই বিষময়তা থেকে নিষ্কৃতি লাভ করতে চায় মন। চিত্ত-বিকারে অনেক সময় মন চায় নিজেকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে নিতে। প্রেমকান্ডের জেরে মা-বাবার কাছে অযথা বকুনি খেলে জীবনকে ধিক্কার দিয়ে প্রাণকে বাঁচিয়ে রাখার অযোগ্য মনে হতে পারে। পরকীয় প্রেমে জড়িয়ে গেলে স্বামীর কাছে উপেক্ষিতা হলে দুর্বল মনে জীবনকে নষ্ট করাই উত্তম মনে হতে পারে। স্ত্রী প্রতারণা করলে লাঞ্ছনা ও ধিক্কারে জীবনের পাতা থেকে নিজেকে মুছে দেওয়া ভাল মনে হতে পারে। প্রেমিক বা প্রেমিকার কাছে উপেক্ষিত হলে অথবা প্রেমে অসফল হলে ধিক্কারে জীবন বিসর্জন দেওয়াকে ভাল মনে হতে পারে। প্রেমরোগজ্বালায় অতিরিক্ত ক্লিষ্ট হলে আরাম পাওয়ার আশায় নিজেকে হত্যা করা শ্রেয় মনে হতে পারে। নগ্ন ছবি মোবাইল বা ক্যামেরাবন্দি ক’রে ব্লাকমেল করার চেষ্টা করা হলে লজ্জা ঢাকার জন্য আত্মহত্যা করে অনেক প্রবঞ্চিতা। ‘পেরেছি যতেক কুড়ায়ে লয়েছি দুই হাতে ভালোবাসা, বাধ্য আজিকে করিতে সাঙ্গ জীবনের কাঁদা-হাসা।’ গলায় ফাঁসি দিয়ে, বিষপান ক’রে, ছুরিকাঘাত ক’রে, উঁচু জায়গা হতে ঝাঁপ দিয়ে, পানিতে ঝাঁপ দিয়ে, রেলের সামনে ঝাঁপ দিয়ে বা রেল লাইনে শুয়ে থেকে, গায়ে আগুন লাগিয়ে, নিজেকে গুলি ক’রে আত্মঘাতী হয় অনেক লায়লা-মজনু। মার্কিন মুল্লুকে প্রতি বছর ছয় হাজারেরও বেশী তরুণ আত্মহত্যা করে শুধু ঐ অবৈধ প্রণয়-ঘটিত কারণে। (অপসংস্কৃতির বিভীষিকা ৯২পৃঃ দ্রঃ) কিন্তু হে প্রেম-দেওয়ানা লায়লা-মজনু! কেন করবে আত্মহত্যা? তোমার মনের বিশ্বাস অমূলক বা অদৃঢ় হওয়ার ফলে এমন সিদ্ধান্ত হয়তো গ্রহণ করতে পার। যেহেতু মরণের পর তোমার কী হবে, তা জানা না থাকলে অথবা জানা থাকলেও তাতে অবিশ্বাস থাকলে অথবা অমূলক বিশ্বাস থাকলে তুমি আত্মহত্যায় প্ররোচিত হতে পার। যেমন, তুমি যদি ধারণা কর যে, মরণের পর মানুষের আর কোন জীবন নেই। মৃত্যুর সাথেই সব কিছু শেষ। তাহলে এ জীবনের কষ্ট থেকে মুক্তিলাভের আশায় তুমি আত্মহত্যা করতে পার। যদি মনে কর, মরণের পর জীবন আছে এবং সে জীবনে তুমি তোমার মনের মানুষটির সাথে মিলিত হতে পারবে, তাহলে প্রেমে অসফল হয়ে আত্মহত্যা ক’রে কেবল হোটেল বা দেশ পরিবর্তন করার মতো পরজীবনে গিয়ে দু’জনে মিলিত হয়ে সফল প্রেম-জীবন লাভ করবে। তাহলে তো অতি সহজে বুকে মাথা রেখে অথবা জড়াজড়ি ক’রে অথবা হাত ধরাধরি ক’রে হোটেল বা দেশ পরিবর্তন করাই ভাল। অনেক প্রেমের বীর-বাহাদুর ধারণা করে, প্রেমের পথে মরণ শহীদী মরণ। অনেকে ধারণা করে, ভালোবাসার সহমরণ সুধাময়, সে মরণ মর্যাদা ও গর্বের মরণ। তাদের ধারণা হল, ‘একদিন হবে প্রাণ অবশ্য হরণ, তার তরে মরি সে তো সুখের মরণ। প্রিয়তম সে আমার অতি প্রিয়তম, মরণ তাহার পথে সুধাময় সম। প্রকৃত প্রেমের জানো ইহাই ধরন, নীরবে সহিয়া লয় জীবন-মরণ। জীবন যে ধন্য তার প্রেমের পূজায়, জীবন জুড়ায় এই মরণের পায়।’ মানুষ যখন বিশ্বাস রাখে যে, মরণের পর আবার তার পুনর্জন্ম হবে এই পৃথিবীতে। তখন জায়গা পরিবর্তন করার মতো পরজন্মে প্রেম সাফল্য করার লক্ষ্যে আত্মহনন করে! ‘পরজনমে দেখা হবে প্রিয়! ভুলিও মোরে হেথা ভুলিও।। এ – জনমে যাহা বলা হ’ল না আমি বলিব না, তুমিও বলো না। জানাইলে প্রেম করিও ছলনা, যদি আসি ফিরে, বেদনা দিও।।’ ইসলাম-পরিপন্থী বিশ্বাসের বিশ্বাসী লায়লা-মজনু! জন্মান্তরবাদে বিশ্বাস রেখে যদি ধারণা হয় যে, তুমি মরণের পর আবার ইচ্ছামতো এ পৃথিবীতে জন্ম নিতে পারবে, তাহলে তুমি আত্মহত্যা করতে পার। কুমোর যেমন নরম মাটিকে নিজ ইচ্ছামতো এক পাত্র গড়ে পুনরায় তা ভেঙ্গে অন্য পাত্র গড়তে পারে, তেমনি তুমিও নিজের জীবনটাকে ইচ্ছা ও মনোমতো গড়ে নেবে না কেন? আর সেই ক্ষেত্রে বাংলার অলি-গলিতে সেই বহুল প্রচলিত গান তুমিও হয়তো গাইতে পার, ‘এবার ম’লে সুতো হব তাঁতির ঘরে জন্ম নেব পাছা-পেড়ে শাড়ি হয়ে দুলব তোমার কোমরে!’ কিন্তু না। তুমি নিজের প্রাণ নিজের হাতে ধ্বংস করতে পার না। কারণ এ জীবন তোমার নয়। এ দেহ, এ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মালিক তুমি নও। এ হৃদয়-মন, এ হৃদি-স্পন্দনের মালিকানা তোমার নয়। তুমি তাতে খেয়ালখুশি ও স্বেচ্ছাচারিতার আচরণ করতে পার না। এ জীবন, এ দেহ মানুষের নিজস্ব এমন সম্পত্তি নয় যে, সে তাতে যাচ্ছে-তাই ব্যবহার করতে পারে। অতএব আল্লাহর দেওয়া এই আমানতে সে খিয়ানত করতে পারে না। জীবন যখন মানুষ দান করতে পারে না, তখন তা ধ্বংস করার অধিকারও তার নেই। যে জীবন তোমার সৃষ্ট নয়, সে জীবনকে নষ্ট করায় তোমার কোন এখতিয়ার নেই। দুনিয়ার যন্ত্রণা থেকে আরাম পাওয়ার আশায় পরবর্তী জীবনের দিকে দৌড়ে পালালেও পালাবার পথ নেই। কারণ যাকে তুমি মুক্তিদাতা মনে কর, সে আসলে আরো বড় জল্লাদ। তুমি মুসলিম হলে এসব ধারণা তোমার আদৌ সঠিক নয়, এমন বিশ্বাস তোমার যথার্থ নয়। সঠিক ও যথার্থ বিশ্বাস হল, মরণের পরে জীবন আছে এবং সেটা একটাই জীবন। হিসাবের পর জান্নাত অথবা জাহান্নাম। সঠিক ঈমান রেখে সৎ কাজ ক’রে ইহলোক ত্যাগ করতে পারলে জান্নাতে অবশ্য ইচ্ছাসুখ পাবে। সেখানে গিয়ে তুমি তোমার মনের মানুষটিকে চেয়ে নিতে পারবে। মনের মতো ক’রে জীবন-যাপন করতে পারবে। আর অসৎ কাজ ক’রে ইহলীলা সাঙ্গ করলে জাহান্নামে যেতে হবে। আর সেখানে কোন সুখ নেই, চাওয়া নেই, পাওয়া নেই। সেখানে আছে শাস্তি আর শাস্তি। পরন্তু আত্মহত্যা মহাপাপ। আর তার শাস্তিও আছে দোযখে। তাহলে আত্মহত্যায় যে নিষ্কৃতি নেই, তা সহজে অনুমান করতে পারছ। (প্রেমরোগ) আব্দুল হামীদ আল-ফাইযী আল-মাদানী
Updated: November 5, 2019 — 11:03 am

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *